স্বাদে ও গুনে জগৎ বিখ্যাত বর্ধমানের শক্তিগড়ের ল্যাংচা। জিআই স্বীকৃতির দাবি প্রস্তুতকারকদের
1 min read
বেশ কয়েক বছর আগের কথা, শক্তিগড় বাজারে এসে থামলো গাড়ি। গাড়ি থেকে নামলেন সুদর্শনা মহিলা, সুচিত্রা সেন। সাথে আরো বেশ কয়েকজন অভিনেতা অভিনেত্রী। সকলের সোজা গেলেন ল্যাংচা দোকানে। মন ভরে খেলেন পূর্ব বর্ধমানের শক্তিগড়ের শক্তি সিদ্ধ ল্যাংচা।
আসলে বর্ধমানের নাম শুনলেই প্রথমে মনে আসে সিতাভোগ, ল্যাংচা সহ একাধিক মিষ্টির নাম। আর এই মিষ্টি দের মধ্যে অন্যতম হল ল্যাংচা। তবে এই ল্যাংচা মিষ্টির ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির আবেদন জানিয়েছে মিষ্টি বিক্রেতারা। দরবারও করেছেন প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তরে।
প্রায় ১০০ বছরেরও পুরনো পূর্ব বর্ধমানের শক্তিগড়ের ল্যাংচা। স্বাদে ও গুণে মন কারে সকলের। স্থানীয়দের কথায় ব্রিটিশ সময় থেকেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই শক্তিগড়ের ল্যাংচা এখন জগৎবিখ্যাত। জনশ্রুতি আছে কৃষ্ণনগরের রাজকন্নার সাথে বর্ধমানের রাজ পরিবারের রাজকুমারের বিয়ে হয়। মাতৃত্বকালীন সময়ে যখন কোন খাওয়ারই মুখরোচক হচ্ছিল না রাজরাণীর কাছে তখনই মুখের স্বাদ বদলাবার জন্য এক ময়রা তৈরি করেছিল তুলতুলে এক মিষ্টি। তবে সেসময় মিষ্টির নাম নিয়ে সন্ধিহান অবস্থায় ছিল প্রত্যেকে। স্থানীয়দের মতে যে ময়রা এই সুস্বাদু মিষ্টি প্রস্তুত করেছিলেন তিনি ছিলেন এক পা খোঁড়া। ময়রা ল্যাংড়া হওয়ার কারণে এই মিষ্টির নাম হয় ল্যাংড়া যা পরবর্তীতে নাম হয় ল্যাংচা। জনশ্রুতির তুলনায় স্বাদে ও গুনে মন কাড়ে প্রত্যেকের।
রসগোল্লা সন্দেশ সহ বিভিন্ন মিষ্টি থাকলেও শক্তিগড়ের বিখ্যাত এই ল্যাংচা মিষ্টি। কি কি দ্রব্য দিয়ে তৈরি হয় এই মিষ্টি? ল্যাংচা দোকানের মালিক আর এস মল্লিক জানিয়েছেন, “ছানার সঙ্গে ময়দা মিশিয়ে তা ছোট নোড়ার মতো আকার দেওয়া হয়। এর পর তা তেল বা গাওয়া ঘিয়ে ভাজা হয়। তারপর ফেলা হয় চিনির রসে। পাঁচ টাকা বা দশ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি হয়।” এভাবেই বছরের পর বছর ক্রমবর্ধমান পরিচিতি লাভ করছে শক্তিগড়ের ল্যাংচা।
বর্ধমান স্টেশন থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট গ্রাম শক্তিগড়। পূর্ব বর্ধমানের বর্ধমান ২ পঞ্চায়েত সমিতির অধীন বড়শূল পঞ্চায়েতের শক্তিগড় গ্রাম এখন জগৎবিখ্যাত।সেখানে একাধিক দোকানের মধ্যে প্রাচীন একটি দোকান রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রায় ১০০ বছর আগে হেমচন্দ্র ঘোষ একটি মিষ্টির দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। হেমচন্দ্রের প্রতিষ্ঠা করা এই ল্যাংচা দোকানে খেয়েছিলেন মহা নায়িকা সুচিত্রা সেন। তবে বর্তমানে শক্তিগড় থেকে অনতি দূরে আমরা নামক জায়গায় ২ নং বর্ধমান থেকে কলকাতা গামী জাতীয় সড়কের ধারেই বহু ল্যাংচা দোকান গড়ে উঠেছে। বছর ৯০ এর স্থানীয় বাসিন্দা শেখ আবু বক্কর জানিয়েছেন, ” ছোট থেকেই আমি পরিচিত ল্যাংচার সাথে। নিয়মিতই এই ল্যাংচা খাওয়া হয়।”ল্যাংচার ইতিহাস বলতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা শেখ রহমত আলী বলেন, “শক্তিগড় বললেই প্রথমে মনে আসে ল্যাংচার নাম। স্বাদে ও গুণে অন্যান্য জেলার থেকে বিখ্যাত এই শক্তিগড়ের ল্যাংচা। গাওয়া ঘি দিয়ে ভাজা ল্যাংচা এর স্বাদ একবার জিভে লাগলে তা ভোলার নয়।”
পূর্ব বর্ধমানের সীতাভোগ, জয়নগরের মোয়া জিআই স্বীকৃতি পেলেও প্রশাসনের কাছে দরবার করেও মেলেনি শক্তিগড়ের ল্যাংচা এর জিআই স্বীকৃতি। স্থানীয় দোকানদারদের বক্তব্য,’২০২০ সালে জেলাশাসকের কাছে ভৌগোলিক স্বীকৃতির জন্য ল্যাংচা প্রস্তুতকারকেরা আবেদন জানিয়েছিলেন। সবদিক বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সেই আবেদন পাঠানো হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন তরফে জানানো হয়েছে।’ তবে জিআই স্বীকৃতি পেলে ই আরো মান ও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি আর ও বৃদ্ধি হবে এই বিশেষ মিষ্টির। জিআই স্বীকৃতির আশায় প্রস্তুতকারকেরা। সরকারিভাবে শক্তিগড়ের ল্যাংচা নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।
